ঢাকা , শনিবার, ০৫ এপ্রিল ২০২৫ , ২১ চৈত্র ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ই-পেপার
সংবাদ শিরোনাম
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বড় আঘাত গণতান্ত্রিক স্থিতিশীল শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন মোদির দুর্নীতি প্রতিরোধে কাজ করতে বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড এমওইউ মোদীকে দশ বছর আগের কথা মনে করিয়ে ছবি উপহার ইউনূসের নতুন সমীকরণে বাংলাদেশ-ভারত বাস চালকের হদিস মেলেনি আহত শিশু আরাধ্যকে ঢাকায় হস্তান্তর নিহত বেড়ে ১১ স্বস্তির ঈদযাত্রায় সড়কে ঝরলো ৬০ প্রাণ চালের চেয়েও ছোট পেসমেকার বানালেন মার্কিন বিজ্ঞানীরা আ’লীগের নেতাদের রাজকীয় ঈদ উদযাপনে ক্ষুব্ধ কর্মীরা আন্দোলনে ফিরবেন বেসরকারি কলেজ শিক্ষকরা মাদারীপুরে আগুনে পুড়ল ২ বাড়ি ভৈরবের ত্রি-সেতুতে দর্শনার্থীদের ভিড় বর্ষবরণের আয়োজন, পাহাড়ে উৎসবের রঙ ঈদের আমেজ কাটেনি বিনোদন স্পটে ভিড় আ’লীগকে নিষিদ্ধ করা বিএনপির দায়িত্ব নয় নতুন নিয়মে বিপাকে ট্রাভেল এজেন্সিগুলো ঈদের আগে বেতন-বোনাস পেয়ে স্বস্তিতে সাড়ে ৩ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক ঈদযাত্রায় সদরঘাটে চিরচেনা ভিড় মিয়ানমারে ভূমিকম্পে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা

তিন কলেজ সংঘাতে রণক্ষেত্র

  • আপলোড সময় : ২৫-১১-২০২৪ ১০:৫২:৩৭ অপরাহ্ন
  • আপডেট সময় : ২৫-১১-২০২৪ ১০:৫২:৩৭ অপরাহ্ন
তিন কলেজ সংঘাতে রণক্ষেত্র
রাজধানীর ডেমরা-যাত্রাবাড়ীতে শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধসহ আহত ৩৫ জন * শিক্ষার্থীদের ‘মেগা মানডে’ ঘোষণা, ‘সতর্ক’ থেকেই দায় সারলো পুলিশ * টাকা সার্টিফিকেট ল্যাপটপ সব লুটপাট * ম্যাগজিন চুরি, ৮ হাজার শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা


শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ এবং ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের (ডিএমআরসি) শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় রাজধানীর ডেমরা-যাত্রাবাড়ী এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় লোকজনও। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনতে বিপুলসংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এ সংঘর্ষ শুরু হয়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
প্রথমে সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল কলেজের শিক্ষার্থীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে ডা. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালান। তাদের সঙ্গে যোগ দেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে আগুন দেয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় মোল্লা কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেয় স্থানীয় লোকজন। সংঘর্ষ চলাকালে আহত হয়ে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তবে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, সংঘর্ষ চলাকালে বিভিন্ন সড়কে শিক্ষার্থীদের লাঠিসোঁটা হাতে দৌড়াদৌড়ি করতে দেখা গেছে। ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার কারণে এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের সময় দুটি কলেজেই পরীক্ষা চলছিল। শিক্ষার্থীরা হামলা চালালে পরীক্ষার্থীরা ভয়ে এদিক-ওদিক ছুটতে থাকেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় ডেমরা-যাত্রাবাড়ী এলাকার সড়কে যানচলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ঘটনার সময় পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তাদের ভূমিকা ছিল নীরব।
সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুল সরকারি কলেজে ভাঙচুরের প্রতিবাদে গতকাল সোমবার ‘মেগা মানডে’ ঘোষণা করেন প্রতিষ্ঠান দুটির শিক্ষার্থীরা। ঘোষণা অনুযায়ী জড়ো হয়ে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে (ডিএমআরসি) হামলা-ভাঙচুর চালিয়েছে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। আহত হয়েছে অনেকে। কয়েকজন নিহত হওয়ার দাবিও করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
তিন কলেজে গুলিবিদ্ধসহ আহত অন্তত ৩৫: রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর কাজলার ড. মাহবুবুর রহমান কলেজ, কবি নজরুল কলেজ ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষে অন্তত ৩৫ জন আহত হয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুর থেকে তাদের আহত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয়। আহতরা হলেন-সোহরাওয়ার্দী কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের রাজীব (১৯), শাহেদুল (২০), আশিকুল (২১), রোহান (১৯), সম্রাট (১৮), জয় (১৮)। কবি নজরুল সরকারি কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের রানা (২০), মারুফ (১৯), হাসিনুর (১৯), সিফাত (১৮), জাহেদুল (২১), আসিফ মাহমুদ (১৮), সাকির (১৯), জুবায়ের রহমান সাজ্জাদ (১৯), সৈকত (১৯), জারিফ (১৮), এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের আরাফাত (১৯), মারুফ (২২), অনার্স প্রথম বর্ষের অনুপম দাস (২৩), জুয়েল ইসলাম (২২), নাঈম (২২), অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের সুমন (২২)। ইম্পেরিয়াল কলেজের প্রথম বর্ষের হুমায়ুন (২০)। সলিমুল্লাহ কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের রুমান (১৯), নোমান (২০), এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের সাইদুল ইসলাম (১৯), অনয় (২১), আব্দুর রহমান (২০); অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের রাজীব (২৪)। মাহবুবর রহমান মোল্লা কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের নাফি (১৮) (গুলিবিদ্ধ), অনার্স প্রথম বর্ষের ইনতিয়াক (২২)। দোলাইপাড় এ কে স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থী তাসরিফ (১৮)। দনিয়া ব্রাইট স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র মাহিম হোসেন (১৫)। রাজারবাগ পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসি প্রথম বর্ষের আরাফাত (১৯)। তবে ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক বলেন, যাত্রাবাড়ী থেকে আহত অবস্থায় অন্তত ৩৫ জনকে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয়েছে। এদের মধ্যে বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মাথায় এবং শরীরে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এ ছাড়া, মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের এক শিক্ষার্থীর পেটে গুলি লেগেছে। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন তিনি।
গুলি ভর্তি ম্যাগজিন চুরি, ৮ হাজার শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে পুলিশের মামলা, ভাঙচুর, গুলিভর্তি ম্যাগজিন চুরির অভিযোগে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজের আট হাজার শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। গত রোববার পুলিশের উপ-পরিদর্শক এ কে এম হাসান মাহমুদুল কবীর বাদী হয়ে রাজধানীর সূত্রাপুর থানায় এই মামলা করেছেন। সোমবার আদালতের সূত্রাপুর থানার সাধারণ নিবন্ধন শাখারুম সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ২৪ নভেম্বর ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজের ৭/৮ হাজার শিক্ষার্থী বেআইনি জনতাবদ্ধে মারাত্মক অস্ত্র-শস্ত্রসহ দাঙ্গা সৃষ্টি করে সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করে। সরকারি অস্ত্রের (পিস্তল) গুলি ভর্তি ম্যাগজিন চুরি, সরকারি ডিউটিতে ব্যবহৃত এপিসি গাড়ি ভাঙচুর করে ক্ষতিসাধন করে। কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ করা, জীবননাশের হুমকি দেয়া এবং ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করে। এছাড়া পুলিশের আর্মড পুলিশ কার (এপিসি) ও ডিউটিরত পুলিশের  মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে সর্বমোট দুই লাখ ৭০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এতে পেনাল কোড ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৫(৩) ধারার অপরাধ আনা হয়েছে।
রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা-পুলিশ প্রধানের পদত্যাগ দাবি: ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের সঙ্গে কবি নজরুল ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা-পুলিশ প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় শিক্ষার্থী ও সাধারণ প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাদের দাবি, একদিন আগেই ঘোষণা দিয়ে একদল শিক্ষার্থী এসে ভাঙচুর করলো, অথচ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শুধুই চেয়ে দেখল। উদ্ভূত এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না নিতে পারার সব দায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা-পুলিশ প্রধানের। অবিলম্বে এই দায় নিয়ে তাদেরকে পদত্যাগ করতে হবে। এদিন বিকেলে সংঘর্ষের কারণ এবং প্রশাসনের ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা এসব দাবি করেন। হামিমুল কবির নামে ড. মোল্লা কলেজের এক শিক্ষার্থী বলেন, সকাল থেকেই আমরা আমাদের কলেজের সামনে অবস্থান নিয়েছিলাম। তখন আমরা ছিলাম ২০০ জনের মতো কিন্তু হঠাৎ করেই তারা হাজার-হাজার শিক্ষার্থী এসে একসঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এ সময় কারো হাতে রামদা, কারও হাতে বিদেশি অস্ত্র এমনকি বোমাও ছিল। তিনি বলেন, এমন পরিস্থিতিতে তাদের সঙ্গে টিকতে না পেরে আমরা পিছু হটি। এ সময় আমাদের বেশকিছু বন্ধু-বান্ধব মারাত্মকভাবে আহত হয়। এই সুযোগে তারা কলেজ ক্যাম্পাসের ভেতরে ঢুকে এবং ব্যাপক ভাঙচুর করে। এ সময় ভেতরে থাকা বেশকিছু শিক্ষার্থী এবং কর্মচারীকে তারা বেধড়ক মারপিট করে। আমরা শুনতে পাচ্ছি কবি নজরুল ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীদের এই সন্ত্রাসী হামলায় আমাদের বেশ কিছু শিক্ষার্থী মারাও গেছে। সংঘর্ষের মূল সূত্রপাত সম্পর্কে জানতে চাইলে আব্দুল হাকিম নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, এই ঘটনার মূল সূত্রপাত হয় ঢাকা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে। সেখানে ড. মোল্লা কলেজের এক শিক্ষার্থী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিতে গিয়ে মৃত্যু হয়। এর প্রতিবাদে মোল্লা কলেজসহ ২৫টি কলেজ একত্রে আমরা আন্দোলন করতে গিয়েছিলাম। সেদিন সোহরাওয়ার্দী কলেজেও আমাদের সঙ্গে ছিল। তিনি বলেন, আমাদের আন্দোলন চলাকালীন সময় সোহরাওয়ার্দী কলেজের কিছু শিক্ষার্থী টাকা খেয়ে আমাদের বিরুদ্ধে চলে যায়। এমনকি সেদিন তারা আমাদের কিছু ছেলেকে মেরে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। এভাবে তারা দুইদিন আমাদের পিটিয়েছে, তারপরও আমরা কিছু বলিনি। এরপর আমরা সোহরাওয়ার্দী কলেজের দিকে এগিয়ে গেলে ভেতর থেকে ককটেল এবং গুলি ছোড়া হয়। তখন আমাদের স্টুডেন্টরা ক্ষিপ্ত হয়ে ভেতরে ঢুকে যায় এবং ভাঙচুর চালায়। এরপর তারা আজকে সাতটি কলেজ মিলে আমাদের মারতে এসেছে। কামরুজ্জামান নামে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, মোল্লা কলেজের প্রতিটি ডিপার্টমেন্ট, প্রতিটি ল্যাব সোহরাওয়ার্দী কলেজ ও কবি নজরুলের শিক্ষার্থীরা এসে তছনছ করে ফেলেছে। কলেজের ভেতরে এমন একটা জিনিস নেই যা অক্ষত অবস্থায় আছে। তিনি বলেন, প্রশাসন যদি সময়মতো আসত এবং যথাযথ ব্যবস্থা নিত তাহলে আজকের এ অবস্থা হতো না। তাদের হামলায় আমাদের অসংখ্য শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। শুনেছি বেশ কয়েকজনের মৃত্যুও হয়েছে। আজকের এই পরিস্থিতির জন্য পুরোপুরি দায়ী আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তারা কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে বরং তামাশা দেখেছে। মুক্তার আলী নামে আরেক স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, একদিন আগেই ঘোষণা দিয়ে শিক্ষার্থীরা ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে এসে ভাঙচুর করেছে। এমনকি তাদের হামলায় বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর পাশাপাশি শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছে। এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের কী কিছুই করার ছিল না? নাকি তারা দুই পক্ষের মারামারি দেখে মজা নিয়েছে? আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ কী? তারা চাইলেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। এই যে আজকে বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীর প্রাণ গেল, তার দায় কি রাষ্ট্র নেবে? তিনি আরও বলেন, আমি মনে করি এই ব্যর্থতার দায়ভার নিয়ে পুলিশ প্রধানসহ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ করা উচিত। তাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণেই আজ দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বেহাল দশা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অ্যাকশনে গেলে আরও রক্তপাত হতো : ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের সঙ্গে কবি নজরুল ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীদের হামলা-সংঘর্ষের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অ্যাকশনে গেলে আরও রক্তপাত হতো বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। গতকাল সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি এসব কথা বলেন। আসিফ মাহমুদ বলেন, শত চেষ্টা ও বসে সমাধান করার আহ্বান জানানোর পরও শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে জড়ানো থেকে আটকানো গেল না। শিক্ষার্থীদের এগ্রেসিভনেস ও প্রস্তুতি দেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও স্ট্রিক্ট অ্যাকশনে যায়নি। কোনো প্রকার অ্যাকশনে গেলেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষ ও রক্তপাত হতো। তিনি বলেন, সব পক্ষকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানাচ্ছি। একত্রে দেশ গড়ার সময়ে সংঘর্ষের মতো নিন্দনীয় কাজে জড়ানো দুঃখজনক। এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।
টাকা-সার্টিফিকেট-ল্যাপটপ সব লুট হয়ে গেছে : রাজধানীর কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সোহরাওয়ার্দী কলেজসহ বেশ কয়েকটি কলেজের শিক্ষার্থীদের হামলায় ডেমরার ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে (ডিএমআরসি) প্রায় ৫০-৬০ কোটি টাকার মতো ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ওবায়দুল্লাহ নয়ন। সোমবার বিকেলে কলেজ ক্যাম্পাসে গণমাধ্যমকর্মীদের ব্রিফিংয়ের সময় তিনি এ দাবি করেন। ওবায়দুল্লাহ নয়ন বলেন, শিক্ষার্থীদের হামলায় আমাদের ১২ তলা ভবনের কোনো কাঁচ আর অক্ষত নেই। ৫টি লিফট, কম্পিউটার ও সায়েন্স ল্যাব ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হামলাকারী শিক্ষার্থীরা নগদ টাকা, শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট, সার্টিফিকেট, ৩০০০ এর উপরে ফ্যান, প্রায় ৩০টির মতো ল্যাপটপ, অসংখ্য কম্পিউটারসহ মূল্যবান ও প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস ভাঙচুর ও লুট করেছে। আজকে হামলা হতে পারে সেটি গত রোববার রাতে জেনেছি। তবে এমন অবস্থা হবে সেটা বুঝতে পারিনি। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা এমন করতে পারে আমরা ভাবিনি। আমাদের সব ধ্বংস করে দিয়েছে। দ্বন্দ্ব-সংঘাত থেকে ফেরাতে শিক্ষার্থীদের কলেজমুখী করার বিকল্প নেই। শিক্ষার্থীদের পুঁজি করে কুচক্রী মহল কাজ করছে। এটা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে দেশ অন্যদিকে চলে যাবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা আমরা চাই না। হামলার সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ ভূমিকা রাখেনি বলেও অভিযোগ করেন ডিএমআরসি অধ্যক্ষ। তিনি বলেন, সকাল থেকেই পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু হামলার সময় তারা দূরে থেকে পরিস্থিতি দেখেছেন। হামলাকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
মোল্লা কলেজ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বিবৃতি : ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশরাফ সামীর সোমবার এক বিবৃতিতে জানান, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এক নৃশংস হামলা চালানো হয়েছে। তথাকথিত সাত কলেজ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে বহিরাগত একদল সন্ত্রাসী প্রবেশ করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। এ হামলায় শতাধিক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর, যাদের মধ্যে কয়েকজনকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ এবং ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের কিছু ছাত্র নামধারী ব্যক্তি নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের মদদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। হামলাকারীদের অধিকাংশই শিক্ষার্থী নয়, বরং সন্ত্রাসী কার্যক্রমে লিপ্ত বলে অভিযোগ করা হয়। হামলাকারীরা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র, সম্পদ ও শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত মালামাল লুট করেছে। এ ছাড়া কলেজ ভবনের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে তারা অধ্যক্ষের কার্যালয়সহ বিভিন্ন কক্ষ ভাঙচুর করে। কলেজ কর্তৃপক্ষ বারবার প্রশাসনের স্থানীয় ও সর্বোচ্চ পর্যায়ে সহযোগিতার আবেদন করলেও এ পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এ অবস্থায় আমাদের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
যা বললেন ওয়ারী বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মো. ছালেহ উদ্দিন: ঘটনাস্থলে থাকা ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (ওয়ারী বিভাগ) মো. ছালেহ উদ্দিন বলেন, ছাত্ররা দেশের ভবিষ্যৎ। আমরা চাই না দেশের কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এভাবে আক্রান্ত হোক। কলেজ ভার্সাস কলেজ প্রতিযোগিতা হোক, মারপিট হোক এটা কিন্তু আমরা কখনো চাই না। আমি সব কলেজের গভর্নিং বডি এবং অভিভাবককে বলব, আপনাদের সন্তানকে বাসায় রাখুন। এটা আলোচনার মধ্যে সমাধান হবে। আমরা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করছি, এই জাতীয় সমস্যা যাতে ভবিষ্যতে না হয় সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।  তিনি বলেন, আমরা বিকেল চারটায় তাদের সঙ্গে বসেছি। আমরা চেষ্টা করছি আলাপ-আলোচনার মধ্যে যেন সমাধান হয় সে প্রচেষ্টা আমরা রাখব। সর্বশক্তি দিয়ে আমরা এটা অব্যাহত রাখব। বর্তমানে আমাদের সঙ্গে র?্যাব ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা আছেন। সবার প্রচেষ্টায় এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক আছে।
হামলা-সহিংসতায় কারও ইন্ধন থাকলে কঠোর হাতে দমন : রাজধানীতে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গত দুইদিন হামলা ও সংঘর্ষে জড়ান ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা, কবি নজরুল ও সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীরা। এতে কলেজগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি বহু শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া সম্প্রতি ঢাকা ও সিটি কলেজের মধ্যেও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এসব হামলা-সংঘর্ষের পেছনে কারও ইন্ধন থাকলে তা কঠোর হাতে দমন করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেন, রাজধানীতে শিক্ষার্থীদের কোনো ধরনের সংঘর্ষে না জড়িয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ধরনের সংঘাতের পেছনে কোনো ইন্ধন থাকলে কঠোর হাতে দমন করা হবে। তিনি বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেসব সংঘাত-সংঘর্ষ হয়েছে, সরকার তার প্রতি নজর রাখছে। আমরা ছাত্র-ছাত্রীদের কোনো ধরনের সংঘর্ষে না জড়িয়ে শান্ত থাকার আহ্বান জানাই। এ ধরনের সংঘাতের পেছনে কোনো ইন্ধন আছে কি না তা আমরা খতিয়ে দেখছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ দেশের অন্য যেকোনো অঙ্গনে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা কঠোর হাতে দমন করা হবে।
যাত্রাবাড়ী-ডেমরা এলাকায় ৬ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন: রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজে সংঘর্ষের ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যাত্রাবাড়ী-ডেমরা এলাকায় ৬ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। এদিন বিকেল সাড়ে ৩টায় বিজিবি মোতায়েন করা হয় বলে জানিয়েছেন বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম। তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী-ডেমরা এলাকায় ৬ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত রোববার ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে রাজধানীর ৩৫টি কলেজের ছাত্ররা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ ও সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। এ সময় সোহরাওয়ার্দী কলেজে সাত কলেজের পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষার হলেও হামলা চালান ছাত্ররা। তাদের তাণ্ডবে পরীক্ষা পণ্ড হয়ে যায়। পরে বাধ্য হয়ে এই পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ। অপরদিকে রাতে সেন্ট গ্রেগরি কলেজে হামলা চালান সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্ররা। রোববার রাতে এক সংবাদ সম্মেলনে সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থীরা, ভাঙচুর ও প্রশাসনিক কাগজপত্র ফিরিয়ে দিতে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন। এ সময় তারা কলেজের প্রায় ১০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেন। গত ১৮ নভেম্বর ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাহাবুবুর রহমান মোল্লা কলেজের (ডিএমআরসি) শিক্ষার্থী অভিজিৎ মারা যায়। ডেঙ্গু আক্রান্ত অভিজিতের প্লাটিলেট কমে গেলে আগের দিন তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে নিতে চেয়েছিলেন তার পরিবার। কিন্তু ন্যাশনাল মেডিক্যাল কর্তৃপক্ষ তাকে নিতে দেয়নি বলে অভিজিতের সহপাঠীদের অভিযোগ। তারা বলছেন, অভিজিতের মৃত্যুর পর টাকার জন্য লাশ আটকে রাখে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ২০ নভেম্বর ডিএমআরসি কলেজের শিক্ষার্থীরা লাশ নিতে এলেও কোনো সমাধান না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে সন্ধ্যার পর লাঠিপেটা করে পুলিশ শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দেয়। পরদিন ২১ নভেম্বর ডিএমআরসির ছাত্ররা আবার ন্যাশনাল মেডিক্যালে গেলে কবি নজরুল ও সোহরাওয়ার্দী কলেজ ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা করে। তাতে অনেক শিক্ষার্থী আহত হন বলে তাদের অভিযোগ।
 

নিউজটি আপডেট করেছেন : Dainik Janata

কমেন্ট বক্স